ফারুক আহমাদ আরিফ, রাজশাহী থেকে ফিরে: রাজশাহী সদরের মনিরুল ইসলাম অন্য দশজন কৃষকের মতো তিনিও একজন। তবে তার ভাগ্য বদলে দিচ্ছে পলিনেট হাউজ। এ যাদুর ঘর তার হাতে তুলে ধরেছে আলাদীনের চেরাগ। মাত্র ২০ শতক জমির পলিনেটে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন- ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রোকলী, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, মেলন, শসা, ফুলকপি, বাধাকপি, ব্রাসেলস স্প্রাউট, লেটুস, চীনাশাক, গোলাপ, জারবেরা, রজনীগন্ধা ও গাঁদাসহ বিভিন্ন সবজি ও ফুলের চারা বিক্রি করে ৩ বছরে ২৭ লাখ টাকা বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের’ কাছ থেকে বিনামূল্যে পলিনেট হাউজটি পেয়েছি। এটি আমার ভাগ্যের চাকা দ্রুত গতিতে বদলে দিয়েছে। এই তিন বছরে এখানে চারা উৎপাদন করে বিক্রির মাধ্যমে ২৭ লাখ টাকা আয় হয়েছে। সেই টাকায় আধা পাকা ৩২ হাত লম্বা হাফ বিল্ডিং করেছি। পলিনেটের পাশে কয়েক বিঘা জমি লিজ নিয়ে ফলদ, বনজ বৃক্ষসহ লেবুর বাগান করেছি। 

মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিভিন্ন প্রকারের সবজির বীজ থেকে চারা করে বিক্রি করছেন। রাজশাহীর বিভিন্ন জেলার কৃষকরা তার থেকে চারা সংগ্রহ করছে। পলিনেটে বাইকুনুর জাতের আঙ্গুরের চারা করেও বিক্রি করছেন। 

পলিনেট হাউজে জারবেরা ফুল চাষ করেছেন পুঠিয়া উপজেলার মোমিন হোসেন। গত অর্থবছরে পাওয়া পলিনেটে এবারই প্রথম আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি জারবেরা ফুল ২০-২৫ টাকা করে বিক্রি করা যায়। পলিনেটে ৬০% সূর্যালাক প্রতিরোধী, ক্ষতিকর পোকা-মাকড় ঢুকতে পারে না। 

পলিনেট হাউজ সম্পর্কে কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষিকথায় মোছলেহ উদ্দিন সিদ্দিকীর লেখায় বলা হয়েছে, পলিনেট হাউজ উন্নতমানের পলি ওয়েলপেপারে আবৃত চাষযোগ্য কৃষি ঘর। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি নিয়ন্ত্রণ, অত্যাধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ রুখে দিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে বছরব্যাপী উচ্চমূল্যের ফসল ফলানো ও প্রাকৃতিক দুর্যোগেও নিরাপদ ও অক্ষত থাকে। তিনি বলেন, পলিনেট হাউজে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকায় ফল-ফসল ও সবজি চারা আগাম উৎপাদন করে কৃষক অধিক লাভবান হয়। দিনের বেলায় সূর্যরশ্মির শতকরা ৫০ ভাগ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকে। পলিনেট হাউজে ড্রিপ সেচ এবং স্প্রিংকলার ইরিগেশন সুবিধা রয়েছে। স্প্রিংকলার ইরিগেশন সিস্টেম পলিনেট হাউজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কোন কারণে পলিনেট হাউজে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এই স্প্রিংকলার ইরিগেশন সিস্টেম সহজে এর ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে এনে ফসলের উপযোগী ও স্বাভাবিক করে তোলে। আবার ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি গাছের গোড়ায় সাশ্রয়ীভাবে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করায় ফলন আশানুরূপ হয়।

মোছলেহ উদ্দিন সিদ্দিকী বলেন, পলিনেট হাউজে পোকামাকড়ের আক্রমণের আশঙ্কা নেই। এতে বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। এর ফলে বিষমুক্ত নিরাপদ ফসল উৎপাদন নিশ্চিত হয়। উচ্চমূল্যের বিষমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য স্থানে পরিণত হচ্ছে পলিনেট হাউজ।

তপ্ত দুপুর। খা খা রোদে ক্ষেতে কাজ করছেন একই জেলার মজিবুল হাসান রকি। তিনি মালচিং পদ্ধতিতে অফ সিজনে তরমুজ করেছেন ৮ কাঠা জমিতে। সবুজ রঙের তরমুজ ঝুলছে তার ক্ষেতে। 

রাজশাহী সরকারি কলেজে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়াশোনার ফাঁকে মন দিয়েছেন কৃষি কাজে। তিনি বলেন, গত বছর রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রণোদনায় মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজসহ অর্থকড়ি ফসলের আবাদের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সে বছর একটি প্রকল্পটি থেকে একটি প্রদর্শনীও পেয়েছিলেন। তারাই ধারাবাহিকতায় নিজ থেকে এ বছর অফ সিজনে তরমুজ চাষ করেছেন। বর্তমানে ৬৫ টাকা কেজি বা ২৬০০-৩০০০ টাকা মণে তরমুজ বিক্রি করছেন। গত বছর ১৫ কাঠা (স্থানীয় মাপ, ২০ কাঠায় ১ বিঘা) জমি থেকে ২ লাখ ৮ হাজার ও চলতি বছর ৮ কাঠা জমি থেকে ৯২ হাজার টাকাসহ সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করেছেন।

তিনি বলেন, প্রতিটি তরমুজের ওজন ২ থেকে আড়াই কেজি। প্রতিটি গাছে ৬টির মতো তরমুজ ধরলেও রাখা হয় ২টি। তরমুজ চাষে সবচেয়ে বড় বাধা উন্নত মানের বীজের। এক কেজি বীজ কিনতে হয় ২ থেকে আড়াই টাকায়। সরকারকে বীজ উৎপাদনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এ উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, এক বিঘা আবাদে ব্যয় হয় ৩০-৪৫ হাজার ও আয় হয় কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা। সে হিসেবে প্রায় এক লাখ টাকা কৃষকের আয় থাকে। 

রকির পিতা ওয়াহাব আলী জানান, এ বছর গ্রীষ্মকালীন পেয়াজ, তরমুজ, বেগুনের আবাদ করছেন। ৫০ বছর যাবত কৃষি পেশায় যুক্ত থাকা ওয়াহাব আলীর চোখে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ছেলের মালচিং পদ্ধতির চাষাবাদ। নিজেও জড়িয়ে থাকেন ছেলের কাজে। মালচিং পদ্ধতির উপকারীতা সম্পর্কে রকি বলেন, তরমুজ গাছের গোড়ায় সরাসরি রোদ পড়লে গাছ মরে যায়। এক্ষেত্রে মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে গাছ মরে না। তা ছাড়া কোন প্রকার রাসায়নিক কীটনাকশ ব্যবহার না করে বরং জৈব বালাইনাশকে গুরুত্ব দিয়েছেন। 

আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার মো. অনিক মেহফুজ বলেন, দিন দিন এ অঞ্চলে মালচিং পদ্ধতির প্রতি কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠছে। প্রকল্পের পক্ষ থেকে মালচিংয়ের জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম কিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। গত অর্থবছরে অঞ্চলটিতে মালচিংয়ে তরমুজ চাষাবাদে ৬টি প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছর তার ৩ গুণ কৃষক নিজস্ব অর্থায়নে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। 

আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ এস.এম হাসানুজ্জামান বলেন, মালচিং পদ্ধতির কারণে এ অঞ্চলে ফসলের ৩টি থেকে বেড়ে ৫টি হয়েছে। 

প্রকল্প পরিচালক বলেন, আমাদের বড় সফলতা হচ্ছে কৃষকরা প্রথম বছর প্রদর্শনী পাওয়ার পর পরবর্তীতে তাতে নিজেরাই বিনিয়োগ করা ও অন্যান্য স্থানীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ হওয়া। দেখা গেছে, গত বছর যত সংখ্যক কৃষক মাল্চিং পদ্ধতির প্রদর্শনী পেয়েছিল এ বছর তার ৫-৭ গুণ মানুষ নিজেদের অর্থায়নে সেভাবে চাষাবাদ করেছে। এসব সফল কৃষকদের দেখে আশপাশের কৃষকরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কেউ কেউ নিজ অর্থায়নে এসব প্রযুক্তি তৈরি করে ব্যবহার করছে।

নাটোর সদরের নতুন কৃষি উদ্যোক্তা খায়রুল আলম অন্তর অত্র অঞ্চলে কৃষকদের আইডলে পরিণত হয়েছে। ফুলকপি, বাধাকপি, লাউ, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের চারা বিক্রি করছেন তিনি। পাশাপাশি করছেন চাষাবাদও। বর্তমানে ১৩০ বিঘা জমিতে পেয়ারা, আম, ফুলকপি, বাধাকপি, বেগুন, গাজরসহ বিভিন্ন প্রকারের ফল ও শাক-সবজি চাষাবাদ করছেন। গত বছর পাওয়া পলিনেট হাউজ থেকে সবজির চারা বিক্রি করেছেন আড়াই লাখ টাকা। তার আবাদ করা ফুলকপি এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজন হচ্ছে। বিক্রি করছেন উচ্চমূল্যে। 

একই উপজেলার মনির হোসেন পলিনেট হাউজে ক্যাপসিকাম আবাদ করে ভালো ফলাফল পেয়েছেন। প্রকল্পের অধীনে ২০২৩-২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, পালং শাক আবাদ করে ১০ লাখ টাকা বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, এ মৌসুমে পালং শাক করেছেন যা ৩৫ দিনেই বিক্রয়যোগ্য হয়ে যাবে। বিক্রি করা যাবে ৫০ হাজার টাকা।