কৃষি খবর ডেস্ক: বিশ্বের মোট মিঠা পানির সম্পদের প্রায় ৯৯ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানি। কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষের পানীয় জলের চাহিদা পূরণে এই পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে বিশ্বের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি প্রাকৃতিকভাবে পুনর্ভরণের তুলনায় দ্রুতগতিতে উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে নদীর পানিপ্রবাহ, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে Wageningen University & Research (WUR), International Rice Research Institute (IRRI) এবং Cornell University-এর একদল বিজ্ঞানী ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি কাঠামো গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। Nature Water জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন মন্তব্যধর্মী নিবন্ধে তারা এই প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
গবেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিয়ে শুধু কতটা পানি কমে যাচ্ছে, তা নথিবদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়। বরং খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়িত্ব—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পথ খুঁজে বের করতে হবে।
WUR-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. ইঙ্গে দে গ্রাফ বলেন, প্রকৃতি যত দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানি পুনরায় পূরণ করতে পারে, তার চেয়ে বেশি পানি নিয়মিত উত্তোলন করা হলে কার্যত একটি সীমিত পানির মজুত ক্রমাগত কমিয়ে আনা হয়। এই প্রবণতা চলতে থাকলে একপর্যায়ে পরিস্থিতি ‘ওয়াটার ব্যাংকরাপ্সি’ বা পানির দেউলিয়াত্বের মতো সংকট তৈরি করতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
টেকসই ব্যবহারে তিনটি অগ্রাধিকার
গবেষকরা টেকসই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যৌথভাবে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন।
ভূগর্ভস্থ পানির গতিশীলতার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনার সীমা নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণ করা।
পুরো পানি ব্যবস্থার ওপর উত্তোলনের প্রভাব এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা বা দ্বন্দ্ব মূল্যায়ন করা।
স্থানীয় থেকে বৃহত্তর পরিসর পর্যন্ত বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনযোগ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল তৈরি করা।
IRRI-এর পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. অ্যান্টন উর্ফেলস বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি মানুষের চোখের আড়ালে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও যেন তা আড়ালে না থাকে।
তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির গুরুত্ব, অতিরিক্ত উত্তোলনের ক্ষতিকর প্রভাব এবং খাদ্য, প্রকৃতি ও জলবায়ুকে একসঙ্গে বিবেচনা করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সমাধান তৈরিতে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্যের ওপর জোর
গবেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানি বিজ্ঞানী, কৃষি গবেষক এবং পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কীভাবে ভূগর্ভস্থ পানিকে একদিকে খাদ্য উৎপাদনের জন্য এবং অন্যদিকে পরিবেশগত স্থায়িত্বের জন্য ব্যবহার করা যায়, তা আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
তাদের মতে, ভবিষ্যৎ গবেষণায় বৈশ্বিক পর্যায়ের মডেলিংয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ের বাস্তব উদাহরণ এবং স্থানীয় অংশীজনদের মতামতকে একত্র করা যেতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার জন্য আরও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ শুধু পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ও সরাসরি জড়িত। তাই দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।
সূত্র: আইআরআরআই.কম






