কৃষি খবর ডেস্ক: চলনবিলের মাছের সুনাম ঘিরেই গড়ে উঠেছিল সিরাজগঞ্জের শুঁটকিশিল্প। কিন্তু বিলজুড়ে দেশি মাছের সংকটে ক্রমেই কমছে উৎপাদন, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক শুঁটকিমহাল। উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের শুঁটকির বাজারও হয়ে পড়ছে আমদানিনির্ভর। চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশ শুঁটকি এখন আমদানি হচ্ছে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে। এতে সংকটে পড়ছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মাছের মোট উৎপাদন ৭৮ হাজার ৯৪৫ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। যার মধ্যে চলনবিল অংশে (উল্লাপাড়া ও তাড়াশ) উৎপাদন হয় ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৭৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া ও তাড়াশের ৬০টি মহালে (খামার) ৩০২ মেট্রিকটন শুঁটকি উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিকটন শুঁটকি। তবে এ বছর চলনবিলে মাছের সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় শুঁটকির উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা করছেন তারা। তাদের দাবি, সিরাজগঞ্জের শুঁটকিশিল্প মূলত চলনবিলের মাছের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়রা জানায়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাওয়ায় চলনবিলে পানির স্তর কমে যাচ্ছে। সারা বছর যেসব স্থানে পানি থাকত, সেসব স্থানে এখন শুধু বর্ষায় পানি থাকে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য আবাসস্থল, রাস্তাঘাট, বাঁধ ও শিল্প-কারখানা নির্মাণ, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করার ফলে আবাদি পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। ফলে মৎস্য উৎপাদন তথা দেশীয় মাছ উৎপাদন কমছে। তাছাড়া বিষ প্রয়োগ করে বাণিজ্যিক মাছ চাষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানা কারণে চলনবিলে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুঁটকিশিল্পে এই বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
দেশে তৈরি শুঁটকি দিয়ে চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এতে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করতে হচ্ছে শুঁটকি। প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টন শুঁটকি আমদানি হচ্ছে ওই সব দেশ থেকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, আমদানি করা এসব শুঁটকি নিম্নমানের।
ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে তৈরি শুঁটকির গুণগত মান ভালো, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। বিদেশেও চলনবিলের শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। এ বিলের তৈরি শুঁটকির ২০ শতাংশ এখনও বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
মহালের মালিক ইউসুফ আলী বলেন, এখন শুঁটকি উৎপাদনের ভরা মৌসুম। কিন্তু চলনবিলে মাছের অভাব। অন্যত্র থেকে কাঁচা মাছ কিনে এনে মহালে শুঁটকি করা হচ্ছে। গত বছর এই মহালে প্রায় ৩০ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এবার ১০ টন হয় কি-না, সন্দেহ।
এই ব্যবসায়ী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দেশে এখনো বড় মাপের কোনো শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে ওঠেনি। শুধু তাই নয়, শুঁটকি সংরক্ষণেরও বিজ্ঞানসম্মত কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারের এ খাতকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি ও ঋণ সহায়তা পেলে শুঁটকি শিল্পের উন্নতি ঘটবে। ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাড়বে রপ্তানিও।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানভেদে এই শুঁটকি মাছকে এ, বি ও সি গ্রেডে বাছাই করা হয়। এর মধ্যে এ গ্রেডের বা ভালো মানের শুঁটকি রপ্তানি হয় আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, দুবাইসহ ১০-১২টি দেশে। মূলত ঢাকার ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরেই এখানকার শুঁটকি বিদেশে যায়। আর বি ও সি গ্রেডের শুঁটকি মাছ বিক্রি হচ্ছে ঢাকা, সৈয়দপুর ও তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। শুঁটকির আকারভেদে দাম হয় ভিন্ন ভিন্ন। ছোট আকারের মাছের শুঁটকি প্রতিমণ ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বড় আকৃতির মাছের শুঁটকি ২২ থেকে ৩৬ হাজার টাকা মণ।
তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, চলনবিল মাছের সংকটের কারণে ৫০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ থাকায় অন্তত ১০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন। অনেকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
উল্লাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় অবৈধ কারেন্ট ও দুয়ারি জাল ব্যবহার বন্ধ, মাছের পোনা রক্ষা এবং প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।





