কৃষি খবর ডেস্ক: ‘আগে পূজার সময় পদ্মফুল সংগ্রহ করতে খুব বেশি দূরে যেতে হতো না। এলাকার বিল, পুকুর ও জলাশয়েই পাওয়া যেত। এখন সেসব জায়গায় পদ্মফুল দেখা যায় না। দূর থেকে ফুল কিনে আনতে হয়। অনেক সময় চাহিদামতো পাওয়াও যায় না। মায়ের পূজায় যে ফুলের এত গুরুত্ব, সেটির জন্য এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে, কখনো ভাবিনি।’
আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের পূজারি দিলীপ চক্রবর্তী। তার কথায় উঠে আসে জলবায়ু পরিবর্তনের এমন এক সংকটের চিত্র, যার প্রভাব শুধু প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকায় নয়, পড়ছে ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও।
সাতক্ষীরা-খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং মিঠাপানির জলাশয় সংকুচিত হওয়ায় পদ্মের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় বর্ষা ও শরতে যেসব পুকুর, বিল ও জলাশয় পদ্মফুলে ভরে থাকত, এখন সেসব জায়গার অনেকগুলোতেই পদ্মের দেখা মিলছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসবের মধ্যেই পদ্ম সংগ্রহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার উপকূলের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকরা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পদ্ম পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের প্রচলন রয়েছে।
পূজারি দিলীপ চক্রবর্তী বলেন, পদ্ম আমাদের কাছে শুধু একটি ফুল নয়। পূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে এর প্রয়োজন হয়। আগে স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যেত। এখন পদ্মের জন্য অন্য এলাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পরিবেশের এই পরিবর্তন আমাদের ধর্মীয় আচারেও প্রভাব ফেলছে।
শ্যামনগরের মানিকখালী সার্বজনীন পূজামণ্ডপের আয়োজক কমিটির সদস্য প্রসেনজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘গত বছর আমাদের পূজায় ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে পদ্মফুল সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এ বছরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ফুল পাওয়া না গেলে এবারও ভারত থেকে আনার প্রস্তুতি রয়েছে।’
বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদের শ্যামনগর উপজেলা সদস্যসচিব উৎপল মণ্ডল বলেন, ‘আগে পূজার অনেক ফুল স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা যেত। এখন বেশিরভাগই কিনতে হয়। পদ্মের সংকট সবচেয়ে বেশি। দূর থেকে আনতে খরচ বাড়ছে, আবার সব সময় প্রয়োজনীয় ফুলও পাওয়া যাচ্ছে না।’
লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘পদ্ম হারিয়ে যাওয়াকে শুধু একটি ফুলের সংকট হিসেবে দেখলে বিষয়টির ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। দুর্যোগে শুধু অবকাঠামো বা সম্পদ নয়, হারিয়ে যায় লোকায়ত জ্ঞান, গান, রীতি, বিশ্বাস ও প্রথাও।’
তার মতে, এ ধরনের ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির (নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ) গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় এসব ক্ষতির স্বীকৃতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।



