কৃষি খবর ডেস্ক: প্রতিবেশীর কাছ থেকে মাত্র ১০টি হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে দেশি মুরগির নিচে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে শুরু, আর আজ তাঁর গড়ে উঠেছে প্রায় ১৬ একরের সমন্বিত কৃষি খামার। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, মাছ চাষ ও শাকসবজি উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন নোয়াখালীর বিবি রহিমা। তবে করোনা মহামারি ও ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতির পর এখন ঋণের চাপ ও চাঁদা দাবির অভিযোগে নতুন সংকটে পড়েছেন তিনি।
১০টি ডিম থেকে খামার গড়ার যাত্রা
নোয়াখালী সদর উপজেলার কাদিরহানিফ ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের বাসিন্দা বিবি রহিমা। প্রায় ২৩ বছর আগে অভাবের সংসারে বাড়তি আয়ের আশায় প্রতিবেশীর কাছ থেকে ১০টি হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে দেশি মুরগির নিচে দিয়েছিলেন তিনি। সব ডিম থেকেই বাচ্চা ফোটে, যার মধ্যে আটটি ছিল মাদি হাঁস।
সেই হাঁসের ডিম বিক্রি করে টাকা জমিয়ে একটি ছাগল কেনেন রহিমা। ছাগলের বাচ্চা বড় হলে কয়েকটি বিক্রি করে কেনেন গরুর বাছুর। এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর সংখ্যা।
একসময় তাঁর খামারে ২১টি গাভি ছিল। পরে কয়েকটি গরু বিক্রি করে নির্মাণ করেন পাকা গোয়ালঘর।
১৬ একরের সমন্বিত কৃষি খামার
বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে প্রায় ১৬ একর জমিতে খামার পরিচালনা করছেন বিবি রহিমা। তাঁর খামারে রয়েছে ৮টি গরু, ১৩ থেকে ১৪টি ছাগল, ৫০০টির বেশি হাঁস এবং প্রায় ৩৫০টি দেশি মুরগি।

এ ছাড়া রয়েছে মাছের ঘের, পেঁপে ও বরইসহ বিভিন্ন ফলের গাছ এবং লাউ-কুমড়াসহ নানা সবজির খেত। মাছের ঘেরে চাষ হচ্ছে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও পাঙাশ।
খামারের একটি বিশেষ দিক হলো, যতটা সম্ভব নিজের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করেন রহিমা। নিজেই হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফোটান এবং বীজ থেকে সবজির চারা তৈরি করেন। তাঁর স্বামী, সন্তান এবং চার-পাঁচজন শ্রমিক খামারের কাজে সহযোগিতা করেন।
খামারের আয়েই সংসারে সচ্ছলতা
বিবি রহিমা জানান, খামারের আয় দিয়ে দুই ছেলে ও চার মেয়ের পড়াশোনা এবং পরিবারের খরচ চালিয়েছেন। চার মেয়ের মধ্যে দুজনের বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে স্নাতকে পড়ছেন, আরেকজন মাদ্রাসায় মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। তাঁর এক ছেলে সৌদি আরবে চাকরি করেন, আরেক ছেলে খামারের কাজে সহযোগিতা করছেন।
করোনায় অর্ধকোটি টাকার বেশি ক্ষতি
তবে করোনাকালে বড় ধাক্কা খায় রহিমার খামার। লকডাউনের সময় হাঁস-মুরগির খাবার সংগ্রহ করতে না পারায় প্রায় দুই হাজার ডিম দেওয়া মুরগি কম দামে বিক্রি করতে হয়েছিল। ক্রেতার অভাবে নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ দুধ। খাবারের সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া অনেক গরুও বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি।
রহিমার দাবি, করোনা মহামারিতে তাঁর খামারে অর্ধকোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছিল। পরে ঋণ নিয়ে আবারও খামার গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
২০২৪ সালের বন্যায় পৌনে দুই কোটি টাকার ক্ষতি
করোনার ক্ষতি সামলে ওঠার চেষ্টা করছিলেন রহিমা। এর মধ্যেই ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তাঁর খামার।
রহিমার ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যায় ছয়টি গরু, প্রায় দুই হাজার ডিম দেওয়া হাঁস ও প্রায় এক হাজার মুরগি মারা যায় বা ভেসে যায়। এ ছাড়া পুকুর থেকে ভেসে যায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ পাঙাশ মাছ।
সব মিলিয়ে ওই বন্যায় প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কিছু কৃষিবীজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সরকারি সহায়তা পাননি। বর্তমানে তাঁর কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাত্র ১০টি হাঁসের ডিম দিয়ে শুরু করা যে খামার একসময় তাঁর পরিবারের সচ্ছলতার পথ খুলে দিয়েছিল, সেই খামারই এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে। ক্ষতি কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিকভাবে খামার পরিচালনা করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নিরাপত্তা চান বিবি রহিমা।
সূত্র: প্রথম আলো





