কৃষি খবর ডেস্ক: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান জলবায়ুগত। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রায় প্রতি বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। এসব দুর্যাগের মধ্যে বন্যা অন্যতম। চলতি বছর ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ও আকস্মিক বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি, মুরগির খামার, প্রাণিসম্পদ, বীজতলা ও ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। এ দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকেরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় কৃষি, মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৮৭৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে ৪৩টি জেলায় মোট ৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর চাষাবাদ করা জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টন। আর্থিক হিসাবে যা ৪৭৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষিখাত ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে সবজি ও মৌসুমি ফসলের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। ফলে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। এবারের বন্যায় আমন ধানের বীজতলা ও রোপণ করা চারা পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। আউশ ধান কাটার আগেই অনেক জমি প্লাবিত হওয়ায় ফলনের ক্ষতি হয়েছে। পাট পানিতে ডুবে গাছ পচে যাওয়া ও আঁশের মান নষ্ট হয়েছে।
সবজির মধ্যে বেগুন, ডাটা, মরিচ, টমেটো, ঢ্যাঁড়শ, শসা, কুমড়া, লাউসহ বিভিন্ন সবজি নষ্ট হয়েছে। ভুট্টা জমিতে দীর্ঘদিন পানি থাকায় গাছ ও শীষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডালজাতীয় ফসলের মুগ, মসুরসহ বিভিন্ন ডাল পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে আদা, হলুদ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও মরিচের ক্ষতি হয়েছে অনেক এলাকায়। এ ছাড়া ফলের বাগান যেমন- কলা, পেঁপে ও অন্যান্য ফলদ গাছ উপড়ে যাওয়া বা জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অপরদিকে দেশের ৬০২টি ইউনিয়নে মৎস্য সম্পদের ক্ষতি ৩৬৯ কোটি টাকা এবং প্রাণিসম্পদে ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজির, যা মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেক। তথ্য বলছে, ২ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমির শাক-সবজির মধ্যে ৮ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমির ৮৭ হাজার ৯৬৭ টন শাক-সবজি নষ্ট হয়েছে। আর্থিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ২৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি নেমে যাওয়ার পর যে এলাকায় যে ফসল উপযুক্ত; তা স্থানীয় চাহিদা ও আর্থসামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে আবাদ করা উচিত। যেসব জমিতে আমন ধান আবাদ করা সম্ভব হবে না; সেখানে সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল দেওয়া যেতে পারে। তার জন্য বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতসমূহের চারা বা বীজ বিনামূল্যে বিতরণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তা দিলে কৃষকদের ক্ষতি অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। স্বল্পমেয়াদি আমন ধান, যেমন- বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৩৪, ব্রি ধান ৪৬সহ অন্যান্য উপযুক্ত জাত এলাকাভেদে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে রোপণ করা যাবে। এ ছাড়া বিনা ধান-৭, বিনা ধান-১৭, বিনা ধান-২২ জাতসমূহ উপযুক্ততা রয়েছে।
বন্যাপ্রবণ এলাকায় হাস-মুরগির ও গবাদিপশুর স্থান নিরাপদ রাখা অথবা বন্যা পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সেমতে দ্রুততার সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বন্যাপরবর্তী বসতবাড়ি এলাকায় সমন্বিত খামার পদ্ধতি গড়ে তুলতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কিছুটা হলেও সম্ভব হবে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশলসমূহ রপ্ত করার বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা গেলে সুফল মিলবে বেশ। নিচু এলাকার জন্য জলাবদ্ধতা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও বিস্তার ঘটানো এবং আপৎকালীন সারের মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত রাখা জরুরি। পানি চলাচলের রাস্তায় প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলার জন্য উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে শস্যবীমা চালুকরণ; বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য খাল, নালা দ্রুত সংস্কার জরুরি। কৃষিখাতে বণিক শ্রেণির এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর আন্তঃসম্পর্ক জোরদারকরণের মধ্য দিয়ে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থপনা গড়ে তোলা গেলে বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সূত্র: জাগোনিউজ২৪





