কৃষি খবর ডেস্ক: ধানের মতো দেখতে এক ধরনের ঘাস। কিন্তু এর পাতায় হাত বুলাতেই ছড়িয়ে পড়ে লেবুর মিষ্টি সুগন্ধ। সেই ঘাস থেকেই তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত ভেষজ চা, এসেনশিয়াল অয়েল, প্রসাধনী এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক পানীয়। এটি লেমন গ্রাস বা লেবু ঘাস। একসময় যা ছিল অপরিচিত, এখন তা নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসলে পরিণত হচ্ছে। আমের জন্য বিখ্যাত নওগাঁর সাপাহার উপজেলার বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কে বাণিজ্যিকভাবে লেমন গ্রাসের চাষ করে ইতোমধ্যেই দৃষ্টি কাড়ছেন উদ্যোক্তা সোহেল রানা। দেশজুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের কাছেও এটি হয়ে উঠছে নতুন সম্ভাবনার নাম।
শখ থেকে বাণিজ্যিক উদ্যোগ
২০১৫ সালে ঢাকার একটি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে কয়েকটি চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে লেমন গ্রাসের চাষ শুরু করেন সোহেল রানা। পরে ইউটিউব, কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশি তথ্যভান্ডার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এর সম্প্রসারণ ঘটান। বর্তমানে তিনি আধুনিক স্মার্ট ড্রায়ারের মাধ্যমে লেমন গ্রাস শুকিয়ে বাজারজাত করছেন। পাশাপাশি তাজা পাতা ও ডাঁটাও বিক্রি হচ্ছে। এসব পাতা দিয়ে সহজেই তৈরি করা যায় ভেষজ চা।
সোহেল রানা বলেন, ‘প্রথমদিকে মানুষ লেমন গ্রাস চিনত না। এখন স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের কাছ থেকে অনেকেই চারা নিচ্ছেন। শুকনো পাতারও ভালো বাজার তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্বল্প খরচে লাভজনক চাষ
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেমন গ্রাস একবার লাগালে কয়েক বছর পর্যন্ত নিয়মিত পাতা সংগ্রহ করা যায়। এতে রোগবালাই কম হয়, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও তুলনামূলক কম প্রয়োজন হয়। ফলে উৎপাদন খরচ কম হলেও লাভের সম্ভাবনা বেশি।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘লেমন গ্রাস একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ভেষজ ফসল। একবার রোপণ করলে কয়েক বছর উৎপাদন পাওয়া যায়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কম। কৃষকদের জন্য এটি একটি লাভজনক বিকল্প হতে পারে।’
তিনি বলেন, “বর্তমানে ভেষজ চা, প্রসাধনী ও এসেনশিয়াল অয়েলের বাজার দ্রæত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃষকরা যদি পরিকল্পিতভাবে লেমন গ্রাস চাষ করেন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো যায়, তাহলে নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলে এটি নতুন অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ভবিষ্যতে রপ্তানিরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”
রান্নাঘর থেকে প্রসাধনী
একসময় থাই স্যুপ তৈরির উপকরণ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল লেমন গ্রাসের পরিচিতি। বর্তমানে এটি চা, হারবাল ড্রিংক, এসেনশিয়াল অয়েল, সাবান, সুগন্ধি, ডিটারজেন্ট, প্রসাধনী, হেয়ার টনিক, অ্যারোমাথেরাপি এবং ভেষজ ওষুধ তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, জাপান, চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যকর পানীয় ও ভেষজ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে লেমন গ্রাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
স্বাস্থ্যসুরক্ষায় প্রাকৃতিক সহচর
চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, লেমন গ্রাসে রয়েছে সিট্রাল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহনাশক উপাদান, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ। এসব উপাদান মানবদেহে নানা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এটি হজমশক্তি উন্নত করে, গ্যাস, অম্লতা ও বদহজম কমাতে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক হওয়ায় শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও বর্জ্য পদার্থ বের করতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় পান করলে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
এ ছাড়া এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ভ‚মিকা রাখে। ঠান্ডা-কাশির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। পটাশিয়ামসমৃদ্ধ হওয়ায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারে।
লেমন গ্রাসের সুগন্ধ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। অ্যারোমাথেরাপিতে এর তেল দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি বিপাকক্রিয়া সক্রিয় করে ওজন নিয়ন্ত্রণেও এটি সহায়ক বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান ত্বক ও মাথার ত্বকের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। ব্রণ, খুশকি ও ত্বকের প্রদাহ কমাতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
চিকিৎসকের সতর্কতা
নওগাঁ সরকারি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুজার গাফার বলেন, ‘লেমন গ্রাস একটি উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক উপাদান রয়েছে, যা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে এটিকে কোনো রোগের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। পরিমিত মাত্রায় স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। যাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, গর্ভবতী নারী বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাকৃতিক হলেই যে সবকিছু সীমাহীন পরিমাণে খাওয়া নিরাপদ, এমন ধারণা ঠিক নয়। তাই পরিমিত ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
বাজার ও সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশে ২৫০ গ্রাম তাজা লেমন গ্রাসের দাম প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। ১০০ গ্রাম শুকনো লেমন গ্রাস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। প্রতিটি চারা বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেমন গ্রাসের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে ভেষজ চা, এসেনশিয়াল অয়েল ও প্রসাধনী শিল্পে এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
দেশে স্বাস্থ্যকর পানীয়, হারবাল চা ও প্রাকৃতিক প্রসাধনীর বাজার সম্প্রসারিত হওয়ায় লেমন গ্রাসের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। ফলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা এখন এই ভেষজ ফসলকে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন।
সবুজ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে কম খরচে অধিক লাভজনক, পরিবেশবান্ধব ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ফসলের গুরুত্ব বাড়ছে। সেই বিবেচনায় লেমন গ্রাস শুধু একটি সুগন্ধি ঘাস নয়; এটি হতে পারে নওগাঁর কৃষিতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক। পরিকল্পিত চাষ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, মানসম্মত প্যাকেজিং ও রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ‘সবুজ সোনা’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সব সম্ভাবনাই রয়েছে এই ভেষজ ফসলের।





